অনশন শেষে সোনাম ওয়াংচুক: তরুণদের বিক্ষোভে দুর্বল হয়েছেন নরেন্দ্র মোদী
শিক্ষা সংস্কার ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন ভারতকে নতুন বার্তা দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন এই সক্রিয়কর্মী।

ভারতে সম্প্রতি তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নজিরবিহীন আন্দোলনের ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার চরম ধাক্কা খেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনাম ওয়াংচুক। সম্প্রতি ২৬ দিনের আমরণ অনশন পালন করা ৫৯ বছর বয়সী এই আন্দোলনকারী বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই গণবিক্ষোভ দেশটির তরুণ সমাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার নতুন সাহস যুগিয়েছে।
Main Story
শিক্ষাবিদ ও প্রকৌশলী সোনাম ওয়াংচুক ভারতের রাজধানী দিল্লিতে জুন ও জুলাই মাস জুড়ে টানা ২৬ দিন কেবল লবণ ও জল খেয়ে অনশন পালন করেন। এই দীর্ঘ অনশনের শেষ ছয় দিন তাকে জোরপূর্বক হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছিল, যাকে তিনি কারাগারের সাথে তুলনা করেছেন। আন্দোলন চলাকালে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ওয়াংচুক অনশন ভঙ্গ করার পর জানান, দীর্ঘমেয়াদী এই বিক্ষোভে সরকারের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং দেশের তরুণরা নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত হওয়ার বিশ্বাস ফিরে পেয়েছে।
আন্দোলনটির নামকরণ করা হয়েছিল "কাকরোচ" বা আরশোলা আন্দোলন। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যে বেকার তরুণদের আরশোলার সাথে তুলনা করা হলে তরুণ সমাজ তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনটি দ্রুততম সময়ে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে গত এক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় রাজনৈতিক বিরোধিতায় রূপ নেয়।
Background
ভারতে গত ২৫ বছর ধরে স্নাতক স্তরের শিক্ষার্থীদের বেকারত্বের হার ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। বিশাল জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় সমস্যা। ওয়াংচুক উল্লেখ করেন, দেশটির প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থা কেবল বহু নির্বাচনী প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করে কোটি কোটি শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করে, যা বাস্তব কর্মক্ষেত্রের দক্ষতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
তিনি মনে করেন, পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বাস্তবমুখী দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ওপর জোর দেওয়া উচিত। তা না হলে শিক্ষা গ্রহণ করেও তরুণেরা বেকার থেকে যাবে এবং যেসব খাতে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন, সেখানে সংকট তৈরি হবে। তবে ভারত সরকার সরকারের অর্থনৈতিক নীতিকে শক্তিশালী দাবি করে বেকারত্ব সংক্রান্ত উদ্বেগকে অতিরিক্ত বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে বলে পূর্বে মন্তব্য করেছে।
Timeline
- জুন-জুলাই: প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে দিল্লিতে ২৬ দিনের আমরণ অনশন শুরু করেন সোনাম ওয়াংচুক।
- অনশনের শেষ ৬ দিন: ওয়াংচুককে জোরপূর্বক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
- ২৪ জুলাই: ওয়াংচুক তার অনশন ভাঙেন।
- ২৫ জুলাই: তীব্র জনরোষের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন।
- সাম্প্রতিক দিনগুলো: সরকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন, প্রযুক্তি খাতের ব্যক্তিত্বকে দিয়ে পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কারের উদ্যোগ এবং আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেয়।
Key Facts
- আন্দোলনের নাম: প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের প্রতিবাদে আন্দোলনটি "কাকরোচ" বা আরশোলা আন্দোলন নামে পরিচিত হয়।
- অনশনের প্রভাব: ২৬ দিনের অনশনে ওয়াংচুক ১১ কেজি ওজন হারান, যার মধ্যে ৬ কেজি তিনি পরবর্তীতে পুনরুদ্ধার করেছেন।
- বেকারত্ব পরিসংখ্যান: ভারতে তরুণ স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩৫-৪০%।
- রাজনৈতিক প্রভাব: সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে বিজেপি তিনটি আসনের মধ্যে দুটিতে পরাজিত হয়েছে, যার মধ্যে বিহারের একটি আসন ৩০ বছর ধরে তাদের দখলে ছিল।
Latest Developments
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি পরীক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারে উদ্যোগ নিতে এক প্রযুক্তি ধনকূপতিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং প্রশ্ন ফাঁসের কারণে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের সুরক্ষামূলক নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশি হয়রানি, আইনি মামলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্থার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবুও ওয়াংচুক মনে করেন, এই আন্দোলন তরুণদের মধ্যে যে ঐক্য ও সাহসের সঞ্চার করেছে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক চিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
What's Next
সোনাম ওয়াংচুক বর্তমানে লাদাখের লেহ-তে অবস্থান করছেন। তিনি জানান, মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের দর্শনই তার অনুপ্রেরণা। নিজে সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কোনো পরিকল্পনা তার নেই, তবে তরুণ সমাজকে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করতে তিনি কাজ করে যেতে চান। তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে সরকার যদি সাধারণ মানুষের মূল দাবিগুলো না শোনে, তবে তরুণদের এই বিক্ষোভ কেবল শিক্ষা খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা ব্যাপক সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
FAQ
প্রশ্ন: সোনাম ওয়াংচুক কেন অনশন করেছিলেন? উত্তর: ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং উচ্চ স্নাতক বেকারত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দাবিতে তিনি অনশন করেন।
প্রশ্ন: "কাকরোচ" আন্দোলনের নাম এমন হওয়ার কারণ কী? উত্তর: আদালতের শুনানিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি বেকার তরুণদের "আরশোলা"র সাথে তুলনা করার পর তরুণ বিক্ষোভকারীরা আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে এই নামটি বেছে নেয়।
Conclusion
ভারতের তরুণদের সাম্প্রতিক এই আন্দোলন দেশটির নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে সরকারের পরবর্তী পদ পদক্ষেপগুলো দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থায়িত্ব ও তরুণ প্রজন্মের আস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।
